নূতন দিদি পর্ব ৫

আগামী মাসে একটা বড়ো শহর ঘুরে দেখার তোড়জোড় চলছে ꓲ গোছগাছ শুরু হবে এই মাসের শেষের দিক থেকে ꓲ তাই ঘোরার জন্য উপযুক্ত দু’টি ব্যাগ কেনার প্রয়োজন হলো ꓲ অনলাইনে অর্ডার করতে গিয়ে একটা পুরোনো ঘটনা স্মৃতির ঝোলা থেকে বেরিয়ে আসলো ꓲ ঝোলায় এমন সব স্মৃতিরা জায়গা পায়, যাদের চাকা দেওয়া টানা-ট্রলিতে আরাম করে যেখানে খুশি নিয়ে যাওয়া যায় না ꓲ এদের বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয় অহরহ , কিন্তু বার করতে হয় সন্তর্পণে , নাহলে আরো বেশ কিছু অনুভবের কোলাজ বেড়িয়ে পড়ে , দিন সাঙ্গ করে ফেলে ꓲ

ইন্দু-র সাথে আমার আলাপ নূতনদিদির সূত্রে ꓲ নূতনদিদির ময়লা রঙের মেয়ে , আমার থেকে বয়সে ২-৩ বছরের ছোট – জ্যোতির চেয়ে আপাতদৃষ্টিতে কলঙ্কই বেশি ꓲ তাঁর প্রতি আমার স্নেহ ছিল তাঁর মায়ের প্রতি আমার টানের চেয়েও বেশি , যাকে ভালোবাসি তাঁর ভালোবাসার জন ꓲ ভালোবাসা এবং বিরাগ সব দৃষ্টিকেই আপাত করে তোলে ꓲ সে আমাকে ফেরায় নি ꓲ পরিবর্তে পেয়েছিলাম  পাতানো-দিদির আবদার ꓲ এই গল্প আমার ইন্দু-র মুখে শোনা ꓲ

ইন্দু তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে ꓲ তাঁর বড়ো মাসির মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে সে যাবে , মা-বাবার সাথে ꓲ দু’টো বড়ো স্যুটকেস গোছানো হয়েছে কারণ সেখানে তাঁদের দিন পনেরো থাকার পরিকল্পনা আছে যাতে বিধবা মাসি একমাত্র মেয়ের বিয়ের পর ভেঙে না পড়ে ꓲ তাই কিছুদিন ফাঁকাফাঁকা লাগে-তে ঠ্যাকনা দেওয়ার উদ্দেশ্য তাঁর ꓲ হাবড়া অবধি ট্রেনে এসে জানা গেলো ,ইঞ্জিনে বড়োসড়ো গোলযোগ ꓲ ট্রেন যাবে মেরামতির পর ꓲ ওদিকে অত্তো বাড়তি সময় নিয়েও বেরোনো হয়নি যে অপেক্ষা করা যাবে ꓲ গিয়ে তো নূতনদিদি আগে সাজবে , তারপর ইন্দুকে ফ্রক পরিয়ে চুল বেঁধে দেবে ꓲ সময়েই তো কুলাবে না ꓲ ইন্দু-র বাবা মানে জামাইবাবু , উপায় না দেখে বাসে যাওয়া মনস্থির করলেন ꓲ তাঁর দুই হাতে দুটো স্যুটকেস , নূতনদিদির এক হাতে কাঁধের ব্যাগ আরেকহাতে শাড়ীর কুচি, আর পাশে ঝাড়া হাত পায়ে ইন্দু ꓲহন্ত-দন্ত হয়ে মেইন রাস্তায় বনগাঁ যাওয়ার বাস পাওয়া গেলো অবশেষে ꓲ বিয়ে বাড়িতে তাঁরা যখন ঢুকলো তখন বর আস্তে আরো এক ঘন্টা ꓲ সবাই সাজ-গোজে ব্যস্ত ꓲ ভাইবোনদের দেখে ইন্দু-র কচিমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, কিন্তু কেন কি জানি ভাইবোনদের দেখেই নূতনদিদির মুখ যেন কালো হয়ে গেলো ꓲ

নূতনদিদি আস্তে আস্তে শাড়ী বের করে পড়লেন ꓲ চুল আঁচড়ালেন আর একটা লাল টিপ্ পড়ে নিজের সজ্জায় বিরতি দিলেন ꓲ খুবই বেমক্কা একটি ব্যাপার, কারণ নূতনদিদি সাজতে খুব ভালোবাসেন ꓲ তিনি হঠাৎ পড়লেন ইন্দুকে সাজানো নিয়ে ꓲ ছোট্ট পরীর মতো করে তাঁকে সাজিয়ে দিলেন ꓲ আমি পরে ছবিতে দেখেছিলাম ꓲ পরীই বটে ꓲ সাজতে সাজতে হাতে চাঁদ পাওয়া ইন্দু, নূতনদিদিকে জিজ্ঞেস করলো, “মা, সবার শাড়ী চকচকে ! তোমার শাড়ী মামীদের মতো ঝলমল করছে না কেন ? তোমার ঝলমলে শাড়ী নেই?” এর উত্তরে নূতনদিদি বলেছিলেন , “ওঁরা বেনারসি পড়েছে মা ! আমার তাঁতের শাড়ী তো তাই চকচকে নয় ꓲ” কিন্তু সে যাত্রায় ইন্দু-দের আর থাকা হলো না ꓲ দূরের থেকে আশা নিমন্ত্রিতদের মতো প্রথম পাতে খেয়েই সবাই ফেরত আসলো ꓲ এই গল্পটুকু ইন্দু আমাকে ফিরে এসেই বলেছিলো ꓲ আর বলেছিলো , ” জানিস দিদি! ওঁদের স্টেশনটা রাত হলে কি অন্ধকার ! আমার ভয় করছিলো !”

গল্পের দ্বিতীয় অংশ শোনা ইন্দু-র মুখে বছর তিনেক আগে ꓲ ইন্দু চাকরি পেয়ে প্রথম মাসের মাইনে দিয়ে নূতনদিদিকে একটা জামদানী শাড়ী  কিনে দিয়েছে, জামাইবাবুকে একটা পাঞ্জাবি, আর আমাকে একটা ভীষণ সুন্দর লেখার খাতা ꓲ আমাকে খাতাটা দিয়ে ইন্দু বললো, “জানিস শাড়ীটা  নিয়ে মা কেঁদে ফেললো ! বললো, “”আমার জামদানী খুব ভালো লাগে ꓲ এসব যদি আগে পড়া যেত !!!”” আমি বললাম , আগে মানে দিদিদের বিয়ের সময় ??? মা বললো, “”থাক সেসব কথা ! বড়ো ভুল ভেবেছিলাম সেই সময়ে”” আমি বারবার জিজ্ঞেস করাতেও কিছুতেই বললো না কি ভেবেছিলো ꓲ শেষে রাতে শুতে যাওয়ার আগে বললো “”ভেবেছিলাম অন্ধকার স্টেশনে লাইনে ঝাঁপ দেব ꓲ কিন্তু তুই এত্ত ভীতু , অন্ধকার দেখে দেখে কেঁদে কেঁদে সারা হলি””

গল্পটার শেষ অংশটা শুনে আমার চোখের সামনে একটা দৃশ্য এলো ꓲ জামাইবাবুর দুই হাতে দুটো স্যুটকেস , নূতনদিদির এক হাতে কাঁধের ব্যাগ আরেকহাতে শাড়ীর কুচি, আর পাশে ঝাড়া হাত পায়ে ইন্দু ꓲ ইন্দু-র মুখে শুনেছি জামাইবাবু আজকাল দূরে কোথাও যেতে চাননা ꓲ এত্তো বড় বাড়ি ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতে স্বস্তি পাননা ꓲ আমি ভাবলাম যদি কোনোমতে তাঁকে রাজি করানো যায় তাহলেও কি তিনি বাড়ির ফটকে তালা দিয়ে সব স্যুটকেস নিজে তুলে নেবেন? নাকি ক্ষুদ্র জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দুঃখের বোঝা বওয়ার সঙ্গী পাবেন কাউকে ?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s